শুধু পান করা নয়, চা পাতা দিয়ে তৈরি কোন কোন খাবার স্থানীয় চা বাগান শ্রমিকদের নিকট অধিক জনপ্রিয়?
শ্রীমঙ্গলে স্থানীয় চা বাগান কর্মীরা কাঁচা চা পাতা দিয়ে তৈরি ‘পাতিচখা’ বা চা পাতার ভর্তা, মচমচে বড়া বা পাকোড়া, চা পাতার আচার খেতে ভীষণ পছন্দ করেন। এগুলো তাদের অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী এবং জনপ্রিয় খাবার। সাধারণত দুপুরে আহারের সময় রুটি বা ভাতের সাথে খেয়ে থাকেন।
পাতিচখা (চা পাতার ভর্তা)
এটি চা শ্রমিকদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকার সবচেয়ে চেনা এবং ঐতিহ্যবাহী পদ হলো ‘পাতিচখা’। কিভাবে এই খাবার তৈরি করা হয় তার একটি ধারাবাহিক বিবরণ নিচে দেওয়া হল
প্রয়োজনীয় উপকরণ
বাগান থেকে সংগৃহীত কচি চা পাতা, সেদ্ধ আলু, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, সরিষা তেল এবং অনেক সময় সাথে মুড়ি বা চানাচুর মেশানো হয়।
Aপ্রস্তুত প্রনালী
কচি চা পাতা কুচি করে কেটে বাকি উপকরণ গুলোর সাথে হাত দিয়ে মেখে এই ভর্তা বা ‘পাতিচখা’ তৈরি করা হয়। চা পাতা হালকা তেতো ও কষা স্বাদের হওয়ায় সাথে ঝাল তেলের মিশ্রণে এটি খেতে দারুণ সুস্বাদু হয়।
মচমচে বড়া বা পাকোড়া
চা বাগান এলাকার আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সুস্বাদু খাবার চা পাতার তৈরি মচমচে বড়া বা পাকোড়া। বর্তমানে চা শ্রমিকদের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছেও এটি অন্যতম আকর্ষণীয় খাবারে পরিণত হয়েছে।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
বাগান থেকে সংগৃহীত কচি চা পাতা, বেসন অথবা চালের গুঁড়ো, পেয়াজ কুচি, কাঁচা মরিচ কুচি, হলুদ ও জিরা গুঁড়ো, লবন এবং ভাজার জন্য তেল।
প্রস্তুত প্রনালী
প্রথমে বাগান থেকে তোলা একদম কচি ও নরম চা পাতাগুলো ভালো করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে কুচি কুচি করে কেটে নিন। একটি পাত্রে কুচানো চা পাতা, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, বেসন/চালের গুঁড়ো, জিরা গুঁড়ো এবং লবন পরিমাণমত একসাথে নিন। সামান্য পানি মিশিয়ে উপকরণগুলো হাত দিয়ে ভালো করে মেখে একটি আঠালো মিশ্রণ তৈরি করুণ। কড়াইয়ে তেল গরম করে মিশ্রণটি থেকে ছোট ছোট বড়ার আকারে গড়ে ডুবো তেলে ছাড়ুন। চুলার আঁচ মাঝারি রেখে বড়াগুলো উল্টে-পাল্টে লালচে এবং মচমচে করে ভেজে তুলে নিন।
পরিবেশন
বিকেলের গরম চা কিংবা দুপুরে গরম ভাতের সাথে এই মচমচে হালকা তেতো ও ঝাল স্বাদের চা পাতার বড়া খেতে দারুণ লাগে।
চা পাতার আচার
অনেক সময় শ্রমিকরা কাঁচা চা পাতা সংরক্ষণ করার জন্য এবং ভাতের সাথে খাওয়ার জন্য এক ধরণের ঘরোয়া আচার তৈরি করেন। কচি পাতা রোদে সামান্য শুকিয়ে তেল, তেঁতুল বা লেবুর রস এবং মশলা দিয়ে এই টক-ঝাল-মিষ্টি আচার বানানো হয়।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
কচি কাঁচা চা পাতা, সরিষার তেল, তেঁতুলের মাড় বা লেবুর রস, রসুন কুচি ও আদা কুচি, কাঁচা মরিচ কুচি বা শুকনা মরিচ ফাঁকি, পাঁচফোড়ন গুঁড়ো, চিনি বা গুড়, লবন, সিরকা (হোয়াইট ভিনেগার)।
প্রস্তুত প্রণালী
প্রথম ধাপ: পাতার কষ ও তেতো ভাব দূর করতে (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ) প্রথমে বাগান থেকে আনা কচি চা পাতাগুলো ভালো করে ধুয়ে একটি পরিষ্কার পাত্রে গরম পানিতে ছেড়ে ৩ মিনিট ফুটিয়ে নিন। এবার পানি ছেঁকে নিয়ে পাতাগুলো ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। হাতদিয়ে চিপে পাতার ভেতরের অতিরিক্ত পানি সম্পূর্ণ বের করে দিন। যদি পাতা বেশি তেতো মনে হয় তবে এই পদ্ধতিটি আরো একবার করতে পারেন। এরপর পানি ঝরানো সেদ্ধপাতাগুলো ব্লেন্ডারে বা শিল-পাটায় হালকা বেটে (আধ-ভাঙ্গা বা কোয়ার্স পেস্ট) নিন।
দ্বিতীয় ধাপ: কড়াইয়ে সরিষা তেল গরম করুন। তেল গরম হলে তাতে পাঁচফোড়ন দিন। এবার রসুন কুচি ও আদা কুচি দিয়ে হালকা সোনালী করে ভেজে নিন। সুগন্ধ বের হলে আধা-বাটা চা পাতা এবং কাঁচা মরিচ কুচি দিয়ে তেলের উপর মাঝারি আঁচে ৪-৫ মিনিট ভাজুন। এবার স্বাদমতো লবন, তেঁতুলের মাড়/লেবুর রস এবং চিনি দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। চুলার আঁচ কমিয়ে আচারটি অনবরত নাড়তে থাকুন যতক্ষণ না তেল ও মসলা পাতার সাথে ভালোভাবে মিশে আঠালো হয়ে যাচ্ছে। নামানোর ঠিক ২ মিনিট আগে সিরকা (ভিনেগার) ঢেলে দিন। আচার থেকে তেল আলাদা হয়ে উপরে উঠলে চুলা বন্ধ করে দিন।
সংরক্ষণ ও পরিবেশন টিপস
আচারটি পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার পর একটি পরিষ্কার শুকনো কাঁচের বয়ামে সংরক্ষণ করুন। মাঝে মাঝে রোদ দিলে এই আচার প্রায় ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। খিচুড়ি, গরম ভাত কিংবা বিকেলের মুড়ি মাখার সাথে এই টক-ঝাল-মিষ্টি চা পাতার আচার খেতে অসাধারণ।