শ্রীমঙ্গলে পর্যটনের বিকাশ

চায়ের রাজধানী হিসাবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা গত কয়েক দশকে চায়ের বাগানের গন্ডি ছাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রধান ইকো ট্যুরিজম ও কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম হাব-এ পরিণত হয়েছে। দেশের সামগ্রিক পর্যটন খাতের জন্য শ্রীমঙ্গলের পর্যটন শিল্প একটি অন্যতম ও অনুকরণীয় মডেল।

শ্রীমঙ্গলে পর্যটন শিল্পের ধারাবাহিক বিকাশের মূল দিকগুলো আলোচনা করা হল :

অনিন্দ্যসুন্দর চায়ের বাগান :

শ্রীমঙ্গল তার দিগন্তজোড়া সবুজ পাহাড় আর সারি সারি চা বাগানের অনিন্দ্য সুন্দর রূপের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। মাইলের পর মাইল বিস্তৃ এই চা বাগানগুলো দেখলে মনে হয় যেন পাহাড়ের ঢালে কেউ সবুজ গালিচা পেতে রেখেছে যা পর্যটকদের সারা বছর আকর্ষণ করে।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ( Lawachara National Park )

বিরল প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় উল্লুক এর নিরাপদ বাসস্থান এই রেইনফরেস্ট। ট্রাকিং, পাখি পর্যবেক্ষণ এবং জীববৈচিত্রের অভিজ্ঞতার জন্য গবেষক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি অন্যতম সেরা স্থান।

বাইক্কা বিল ( Baikka Beel )

এটি একটি সংরক্ষিত মৎস ও পাখির অভয়ারণ্য, যা পুরোপুরি জলজ পরিবেশ কেন্দ্রিক। জলজ পর্যটনের মূল আকর্ষণ হলো একানকার পাখি। শীতকালে দূর সাইবেরিয়া থেকে আসা পরিযায়ী পাখি এবং দেশীয় বক, পানকৌড়ি, ডাহুক ও ডলফিনের মতো বিপন্ন প্রজাতির জলজ প্রানীর বিচরণ এখানে দেখা যায়। বর্ষাকালে বিলের বুক চিরে দেশীয় নৌকায় নৌকায় ঘুরে বেড়ানো এবং পানির উপর দিয়ে পাখি যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ জলজ পর্যটনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা।
বর্ষার শেষে এবং শীতের শুরুতে এখানে মাইলের পর মাইল শাপলা ও পদ্ম ফুলের মেলা বসে। কলমি লতা, হেলেঞ্চা এবং বিভিন্ন জলজ শ্যাওলার সবুজ গালিচা দেখা যায়।

মাধবপুর লেক ( Madhabpur Lake )

কমলগঞ্জের মাধবপুর চা বাগানের ভেতর অবস্থিত এই লেকটি পাহাড়ি ঝরণা ও বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্ট একটি অনিন্দ্য সুন্দর জলরাশি। এখানকার প্রধান জলজ আকর্ষণ হলো পানিতে ফুটে থাকা শত শত নীল এবং বেগুণী শাপলা। পাহাড়ের সবুজের মাঝে এই ফুলের দৃশ্য পর্যটকদের চোখজুড়িয়ে দেয়।

নৃ-গোষ্ঠীর জীবনধারা ( Trivial Life Style )

মণিপুরীম, খাসিয়া, গারো, সাওতাল, চা-শ্রমিকসহ বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর জীবনধারা এখানকার পর্যটন শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নানা সম্প্রদায়ের বৈচিত্রময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও হস্তশিল্প পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে।

উৎসব ও মেলা ( Festivals and Fairs )

স্থানীয় নৃ-গোষ্ঠীর উৎসব ও মেলার পাশাপাশি বাংলাদেম পর্যটন বোর্ডের উদ্যোগে আয়োজিত বিভিন্ন উৎসব (যেমন ৩ দিন ব্যাপি হারমনি ফেস্টিভ্যাল) টেকসই সাংস্কৃতিক পর্যটনকে আরো বেগবান করছে।

নৃ-গোষ্ঠীর পুঞ্জি/পাড়া ( Trivial Village )

খাসিয়া পুঞ্জি ও মনিপুরী পাড়ায় পর্যটকরা সরাসরি তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও হস্তশিল্প উপভোগ করতে পারে।

গাছে গাছে পান পাতা ( Betel Leaf )

খাসিয়াদের প্রধান জীবিকা হলো খাসিয়া পানের চাষ। পুঞ্জিগুলোতে গেলে দেখা যায় টিলার সুউচ্চ গাছগুলোকে জড়িয়ে সবুজ পানপাতা বড় হচ্ছে যা দেখতে অত্যন্ত মনোরম।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন ( Infrastructure Development )

শ্রীমঙ্গলে পর্যটন বিকামের সাথে সাথে আবাসন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। রাধানগর ও এর আশেপাশে এলাকায় গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের লাক্সারি রিসোর্ট এবং অসংখ্য পরিবেশ বান্ধব ইকো কটেজ।

কমিউনিটি ট্যুরিজম ( Community Tourism )

বর্তমানে পর্যটকদের থাকার জন্য হোমস্টে ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এর ফলে পর্যটকরা খাসিয়াদের ঘরে থেকে তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার খাওয়া এবং জীবনধারা উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

কৃষি পণ্যের সরাসরি বাজার

শ্রীমঙ্গলে গড়ে প্রতিদিন ৫০০০ পর্যটক আসে। পর্যটকরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে আনারস, লেবু, চা-পাতা সংগ্রহ করে থাকেন যা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরত্ম্য কমিয়ে কৃষকদের লাভবান করেছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ

শ্রীমঙ্গলে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা এই অঞ্চলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি কাজ করছে শ্রীমঙ্গল ট্যুরিস্ট পুলিশের একটি চৌকস দল। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি হোটেল-রিসোর্ট, কটেজ, গেস্ট হাউজে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা তদারকিও করা হচ্ছে। সেই সাথে মোটর সাইকেলে পর্যটন শিল্পের দর্শনীয় স্থানসমূহে টহল জোড়দার করা হয়েছে। এই সার্বক্ষণিক নজরদারির ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মাঝে এক বিশাল আস্থা তৈরি করেছে।

যোগাযোগ সুবিধা

ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি ট্রেন ও উন্নত সড়ক যোগাযোগ থাকার কারণে পর্যটকদের কাছে এটি অত্যন্ত সহজ যাতায়াতযোগ্য গন্তব্য হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে।

Get in Touch

Tell us about your business and we will show you exactly how Clarra can help.

Scroll to Top